ওমর ফারুক
দিনভর যানবাহনের হর্ন, মানুষের হাঁকডাক আর ব্যস্ততায় সরগরম নওগাঁ শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকা। সড়ক দিয়ে ছুটে চলে একের পর এক যানবাহন। পথচারীদের ব্যস্ত পায়ে থামার সময় নেই। কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই এই চেনা ব্যস্ততার মধ্যে হঠাৎ যোগ হয় অন্য এক সুর—কিচিরমিচির।

পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের জলিল মার্কেটের সামনে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তারে তখন জড়ো হতে থাকে শত শত পাখি। যেন সারাদিনের শহুরে কোলাহল শেষে তাদেরও একসঙ্গে ফেরার পালা। দল বেঁধে আসে, তারের ওপর বসে, আবার হঠাৎ একসঙ্গে উড়ে যায়। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে আবার বসে পড়ে একই জায়গায়।
সন্ধ্যার এই দৃশ্য দেখতে থেমে যান পথচারীরাও। ব্যস্ত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ পাখিদের দেখেন, কেউ মুঠোফোনে ছবি তোলেন। দোকানের সামনে বসে থাকা মানুষের আড্ডাতেও কখনো কখনো জায়গা করে নেয় পাখিদের কিচিরমিচির।

সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় শহরের জলিল মার্কেট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটে ঢুকার প্রধান ফটকের পাশে অবস্থিত বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে টানা তারের বিভিন্ন অংশে সারি সারি পাখি বসে আছে। কোনো তারে পাশাপাশি কয়েকটি, আবার কোনো অংশে গাদাগাদি করে বসে আছে অনেক পাখি। হঠাৎ একদল পাখি ডানা মেলে আকাশে উড়ে যায়। মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে যায় তারের একটি অংশ। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসে তারা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটি প্রায় প্রতিদিনের দৃশ্য। দিনের বেলায় এত পাখি এখানে দেখা যায় না। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ থেকে পাখিগুলো এসে জড়ো হয়।
হানিফ উদ্দিন নামের জলিল মার্কেটের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘প্রতিদিন সন্ধ্যার দিকে পাখিগুলো এখানে আসে। হঠাৎ করে এত পাখি একসঙ্গে তারে বসলে দেখতে ভালো লাগে। পাখিগুলো সারারাত বিদ্যুতের খুঁটি ও তারে বসে থাকে। আবার খুব ভোরে চলে যায়।’
একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন মাহফুজুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পুরাতন বাসস্টান্ড এলাকায় আমার কর্মস্তল। অফিসের কাজ শেষে প্রতিদিন সন্ধ্যায় জলিল মার্কেটের সামনে অফিসের সহকর্মী ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেই। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে পাখিরাও যেন এখানে আড্ডা দেই। ওদের কিচিরমিচির শুনতে ভালোই লাগে। এই এলাকার মানুষজনও বেশ সচেতন। কেউ পাখিদের বিরক্ত করে না। বরং কেউ পাখিদের বিরক্ত করার চেষ্টা করলে লোকজন প্রতিবাদ করে।
জলিল মার্কেটের সামনে প্রধান সড়কের পাশে ২০ বছর ধরে চা বিক্রি করেন জহুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিদিন নিয়ম করে পাখিগুলো সন্ধ্যায় এসে বিদ্যুতের খুঁটি ও তারে বসে, আবার খুব ভোরে চলে যায়। হয়তো তারা খাবারের খোঁজে বাইরে যায়।

কেন প্রতিদিন সন্ধ্যায় পাখিগুলো এখানে জড়ো হয়, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না স্থানীয় লোকজন। তাদের ধারণা, দিনের ব্যস্ততা শেষে নিরাপদ আশ্রয় বা বিশ্রামের জন্য পাখিগুলো এই জায়গাটি বেছে নেয়।
প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, শহরে গাছপালা ও খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় পাখিদের স্বাভাবিক আবাসস্থলও সংকুচিত হচ্ছে। ফলে বৈদ্যুতিক তার, খুঁটি কিংবা শহরের অন্য স্থাপনাগুলো অনেক সময় পাখিদের সাময়িক আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে।
শহর যত ব্যস্ত হয়, প্রকৃতি যেন ততটাই আড়ালে চলে যায়। তারের ওপর বসা এই পাখিগুলো অবশ্য প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেই দূরত্বটুকু একটু কমিয়ে দেয়। গাড়ির হর্ন আর মানুষের কোলাহলের মধ্যেও তারা মনে করিয়ে দেয়—শহরের বুকেও প্রকৃতি এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
সন্ধ্যা গভীর হলে পাখিগুলোও একসময় সরে যায়। তারগুলো আবার নীরব হয়ে পড়ে। কিন্তু পরদিন বিকেল নামলেই যেন আবার শুরু হয় সেই অপেক্ষা—শহরের আকাশে ডানা মেলে ফিরবে পাখিরা, আর কয়েক মুহূর্তের জন্য কিচিরমিচিরে মুখর হয়ে উঠবে পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের ব্যস্ত এলাকা।


